বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিদিনের সুষম খাদ্যাভ্যাস নির্দিষ্ট পুষ্টির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
১. WHO নির্দেশিত দৈনিক খাবার মেনু (খাদ্য উপাদান)
WHO মূলত দৈনিক ক্যালরির সুষম বণ্টন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেয়:
* ফলমূল ও শাকসবজি: দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম (বা প্রায় ৫ পরিবেশন/ servings) ফল ও শাকসবজি খাওয়া উচিত। এতে আলুর মতো শ্বেতসারযুক্ত খাবার অন্তর্ভুক্ত নয়।
* শস্যজাতীয় খাবার: প্রসেসড বা পরিশোধিত দানার বদলে লাল চাল, লাল আটা, ওটস, ভুট্টা বা বাজরার মতো হোল গ্রেইন (Whole grains) বা অখণ্ড শস্য নির্বাচন করতে হবে।
* প্রোটিন: ডাল, বরবটি, শিমের বিচি, বাদাম এবং চর্বিহীন মাংস, মাছ ও ডিম অন্তর্ভুক্ত রাখা জরুরি।
* ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থ: মোট দৈনিক শক্তির ৩০%-এর কম ফ্যাট থেকে আসা উচিত।
* সর্ষে, অলিভ বা সূর্যমুখী তেলের মতো অসম্পৃক্ত ফ্যাট (Unsaturated fat) গ্রহণ করা ভালো।
* মাখন, ডালডা, চর্বিযুক্ত মাংসের মতো স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স-ফ্যাট এড়িয়ে চলতে হবে।
* লবণ ও চিনি সীমিতকরণ:
* লবণ: দিনে ৫ গ্রামের কম (প্রায় ১ চা চামচ) লবণ খাওয়া উচিত।
* চিনি: মোট খাদ্যাশক্তির ১০%-এর কম চিনি থেকে আসা উচিত (দৈনিক ৫% বা প্রায় ২৫ গ্রামের কম হলে আরও ভালো)।
২. দিনে কয়বার খাওয়া উচিত?
WHO খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে না, কারণ এটি ব্যক্তির বয়স, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন কর্মতৎপরতার ওপর নির্ভর করে।
তবে পুষ্টিবিজ্ঞান ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী:
* প্রধান ৩টি খাবার (3 Main Meals): সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার।
* ১–২টি হালকা নাস্তা (1–2 Healthy Snacks): প্রধান খাবারের মাঝে ফল, বাদাম বা টকদই জাতীয় খাবার।
> মূল নীতি: খাবার দিনে কতবার খাওয়া হচ্ছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মোট ক্যালরি ও পুষ্টির ভারসাম্য ঠিক রাখা।প্রধানত দিনে তিনবার মূল খাবার খাওয়া উচিত—সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার।
তবে শরীরের পুষ্টি চাহিদা এবং বিপাকক্রিয়া (Metabolism) ঠিক রাখতে অনেকেই খাবারকে ৫ থেকে ৬টি ছোট ভাগে ভাগ করে খেয়ে থাকেন।
খাবারের এই নিয়মটিকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সাজালে সাধারণত নিচের মতো হয়:
-
সকালের নাস্তা (Breakfast):
-
সময়: ঘুম থেকে ওঠার ১ থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে (সাধারণত সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে)।
-
গুরুত্ব: এটি সারাদিনের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান খাবার। রাতের দীর্ঘ উপবাসের পর শরীরকে শক্তি জোগাতে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে এটি অত্যন্ত জরুরি। এতে প্রোটিন, ফাইবার ও জটিল কার্বোহাইড্রেট থাকা ভালো।
-
-
দুপুরের খাবার (Lunch):
-
সময়: দুপুর ১টা থেকে ২.৩০টার মধ্যে।
-
গুরুত্ব: দুপুরের খাবারে ভাত বা রুটির পাশাপাশি পর্যাপ্ত শাকসবজি, মাছ বা মাংস এবং ডাল রাখা উচিত, যা সারাদিনের কাজের শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
-
-
রাতের খাবার (Dinner):
-
সময়: রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে (ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে)।
-
গুরুত্ব: রাতের খাবার তুলনামূলক হালকা হওয়া উচিত। ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার খেলে হজমে সমস্যা হতে পারে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
-
মাঝখানের হালকা নাস্তা (Snacks):
-
সকাল ও দুপুরের মাঝখানে: সকাল ১১টার দিকে একটি ফল, বাদাম বা গ্রিন টি খাওয়া যেতে পারে।
-
দুপুর ও রাতের মাঝখানে: বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে মুড়ি, টক দই বা হালকা কোনো স্ন্যাকস খাওয়া যায়।
চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণত দিনে তিনটি মূল খাবার এবং প্রয়োজনে দুইটি হালকা নাস্তা খাওয়ার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সুষম খাবার বা Balanced Diet বলা হয়।
ডাক্তার বা পুষ্টিবিদরা সাধারণত যে বিষয়গুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন:
-
সঠিক সময়ে খাওয়া: প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে। দেরি করে খাবার খেলে গ্যাস্ট্রিক বা হজমের সমস্যা হতে পারে।
-
সুষম খাদ্য তালিকা (Balanced Plate): প্রতি বেলার খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে শর্করা (ভাত/রুটি), প্রোটিন (মাছ, মাংস, ডিম বা ডাল) এবং ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার (শাকসবজি ও সালাদ) রাখা উচিত।
-
পর্যাপ্ত পানি পান: সারাদিনে অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত, যা খাবার হজম করতে এবং শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে।
-
ক্ষুধা অনুযায়ী খাওয়া: চিকিৎসকরা সবসময় পেট পুরে একবারে অনেক বেশি খাওয়ার চেয়ে অল্প করে বারবার খাওয়ার পরামর্শ দেন। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা (Blood Sugar) নিয়ন্ত্রণে থাকে।